‘গুলি করো’ নির্দেশ থেকে শেষ মুহূর্তের পদত্যাগ: শেখ হাসিনাকে ঘিরে আল-জাজিরার তদন্ত ও ট্রাইব্যুনালের অভিযোগ

 ‘গুলি করো’ নির্দেশ থেকে শেষ মুহূর্তের পদত্যাগ: শেখ হাসিনাকে ঘিরে আল-জাজিরার তদন্ত ও ট্রাইব্যুনালের অভিযোগ

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়ে শেখ হাসিনার একটি ফোনালাপের রেকর্ড তাদের হাতে এসেছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্ষমতা ছাড়তে অনড় ছিলেন তিনি।



ছবি: সংগৃহীত

আল-জাজিরার ইনভেস্টিগেটিভ ইউনিটের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রেকর্ড করা একটি ফোনালাপে শেখ হাসিনাকে তার নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার কথা বলতে শোনা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফোনালাপের অডিও কোনোভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পরিবর্তন বা কারসাজি করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে অডিও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কণ্ঠস্বর শনাক্তকরণের মাধ্যমেও ফোনালাপের ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করা হয়েছে বলে দাবি করেছে আল-জাজিরা।

প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়, বিক্ষোভকারীদের জমায়েত লক্ষ্য করে হেলিকপ্টার ব্যবহারের বিষয়েও ফোনালাপে আলোচনা হয়েছিল। একই সময়ে ঢাকার একটি হাসপাতালের চিকিৎসক বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপের অভিযোগ করেন। তবে ওই সময় নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে হেলিকপ্টার থেকে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছিল।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে রংপুরে নিহত শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়, তার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছিল। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে গুলির আঘাতের বিষয়টি বাদ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। তবে আওয়ামী লীগের একজন মুখপাত্র আল-জাজিরাকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, শেখ হাসিনা কখনো নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন দেননি এবং ফোনালাপের রেকর্ডিং খণ্ডিত বা বিকৃত হতে পারে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগে ৪ ও ৫ আগস্ট গণভবনে অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগের বিভিন্ন অংশ পড়ে শোনান। অভিযোগ অনুযায়ী, আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়তে রাজি ছিলেন না এবং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার একাধিকবার আলোচনা হয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ৪ আগস্ট রাতে গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ক্ষমতা ছাড়ার প্রসঙ্গ উঠলে শেখ হাসিনা তা প্রত্যাখ্যান করেন। একই সময়ে বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমনের বিষয়ে আলোচনা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। হেলিকপ্টার ব্যবহার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও বৈঠকে মতবিরোধের কথা বলা হয়েছে।

পরদিন ৫ আগস্ট সকালে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা কমে যাওয়ার কথা জানান। সামরিক কর্মকর্তারাও শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের পরামর্শ দেন। একপর্যায়ে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পদত্যাগের পরিবর্তে তাকে গুলি করে মেরে ফেলার কথা বলেন বলে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এরপর সামরিক কর্মকর্তারা তাকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান। অভিযোগ অনুযায়ী, শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানাও তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। পরে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার পর তিনি মায়ের সঙ্গে কথা বলেন এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্ট দুপুরের আগেই শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। একই সময়ে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গণভবন অভিমুখে মানুষের মিছিল এগিয়ে আসছিল। পরে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান।

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আল-জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত অভিযোগ—দুই ক্ষেত্রেই ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহে শেখ হাসিনার ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ও অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই এ বিষয়ে শেষ কথা বলবে।


এফভিএন সংবাদ প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:২২

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ